যুগে যুগে ধর্মের আগমন

**ধর্ম কি - ধর্ম হচ্ছে একটি শক্তির বিধান, যে শক্তি মানব জীবন ও প্রকৃতির ধারাকে নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্লেষণ করে। পৃথিবীতে মানুষের জীবন যাপনের দিক নির্দেশনা এবং সাম্য-মৈত্রীর বানী নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্মের আগমন ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতবর্ষ হচ্ছে মূলত ধর্মের আদিভূমি।
**ধর্মের উপাদান - ১)বিশ্বাস ২)আচার ৩)পবিত্র ৪)অপবিত্র।
**ধর্মের বিবর্তন বা ভিন্নতা - ১) Fetishism ২)Totem-ism ৩) Animism ৪) Polytheism ৫) Monotheism
** ধর্মের কাজ - ১) মানসিক শান্তি ২) ঐক্য ৩) সামাজিক নিয়ন্ত্র ৪) সমাজের উন্নয়ন ৫) বিনোদন ৬) জীবনের মূল্য।
** ধর্মের অপব্যাখ্যা - ধর্মেকে পুঁজি করে খারাপ ব্যাখ্যা দিয়ে অনেকে খারাপ উদ্দেশ্য ধর্মকে ব্যবহার করে। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন দাঙ্গা সৃষ্টি করছে। আবার এই ধর্মই মানুষকে করেছে সুসংহত, মানবতাবাদী।
** যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্ম -
(ক) ইব্রাহিমীয় ধর্ম - একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোকে ইব্রাহিমীয় ধর্ম বা আব্রাহামিক ধর্ম বলা হয়। যেমন - ইসলাম, খ্রিস্ট ধর্ম, ইহুদি ধর্ম, দ্রুজ ধর্ম, মান্দাই ধর্ম।
(খ) ভারতীয় ধর্ম - হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম, শিখ ধর্ম।
(গ) ইরানী ধর্ম - জরথুস্ত্র, বাহাই ধর্ম, ইয়াজিদি, মাজদাক, আল ই হক।
(ঘ) পূর্ব এশীয় ধর্ম - কনফুসীয় ধর্ম, শিন্তো ধর্ম, তাওবাদ, জেন ধর্ম, হোয়া হাও, ক্যাও দাই।
(ঙ) প্রাচীন মিশরীয় ধর্ম।
(চ) আর্যধর্ম।
(ছ) সামারিতান ধর্ম।
------------------
বিশ্বের প্রধান পাঁচটি ধর্মের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা -
(১) খ্রিস্ট ধর্ম - 'খ্রিস্ট ধর্ম হচ্ছে একেশ্বরবাদী ধর্ম। যীশুর জীবন, শিক্ষাকে নিয়ে এই ধর্ম বিকশিত হয়েছে। খ্রিস্টানরা মনে করে যীশুই মসীহ তাঁকে যীশু খ্রীস্ট বলে ডাকেন। এদের এক অংশ মনে করে - যীশু খ্রীস্ট হচ্ছেন ঈশ্বরের পুত্র। এরা “নিউ টেস্টামেন্ট” বা নতুন গ্রন্থিত বাইবেল কে নিজেদের ধর্ম ধর্মগ্রন্থ মনে করে। আর এক দল তানাখ বা হিব্রু বাইবেল বা ওল্ড টেস্টামেন্ট বা পুরাতন বাইবেল কে নিজেদের ধর্মগ্রন্থ মনে করে। এই ধর্মাবলম্বীরা খ্রিস্টান হিসেবে পরিচিত। এই ধর্মের উৎপত্তির সময়কাল - ২৭ খ্রিস্টাব্দ। সবচেয়ে বেশী সংখ্যাক অনুসারী রয়েছে - ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ওশেনিয়ার অঞ্চলে। সারা বিশ্বে ২১০০ মিলিয়ন (রোমান ক্যাথলিক চার্চ, প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ, অ্যাঙ্গলিকান মতবাদ, অর্থোডক্স চার্চ, আসিরীয় চার্চ, মর্মন ও অন্যান্য খ্রিস্টীয় বিশ্বাস একত্রে) খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারী আছে।
(২) ইসলাম ধর্ম - ইসলাম একেশ্বরবাদী ধর্ম। ইসলাম ধর্ম আল কুরআন সুন্নাহ এবং হাদিস দ্বারা পরিচালিত। আল কুরআন কিতাব যাকে এর অনুসারীরা সরাসরি আল্লাহ'র প্রেরিত বানী এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর নিকট প্রেরিত বলে মুসলমানরা বিশ্বাস করেন। ধর্ম গ্রন্থ আল কোরআন এবং নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর প্রদত্ত শিক্ষা পদ্ধতি, জীবনাদর্শ এর মূল ভিত্তি। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) শেষ নবী। "ইসলাম" শব্দের অর্থ "আত্মসমর্পণ" বা একক স্রষ্টা (আল্লাহর) নিকট নিজেকে সমর্পন করা। আল কুরআন ইসলামের ধর্মগ্রন্থ। আল কুরআন একমাত্র ধর্ম গ্রন্থ যার একটি শব্দও নাজিলের পর হতে পরিবর্তন হয় নাই। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) শেষ নবী। ইসলাম ধর্মের উৎপত্তির সময়কাল - ৬১০ খ্রিস্টাব্দ। বহুল প্রচারিত একটি ধর্ম - মূলত মধ্য প্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এষিয়া (ফিলিপাইন ও পূর্ব তিমুর বাদে), মধ্য এশিয়া, উত্তর আমেরিকা এবং পশ্চিম আফ্রিকা অঞ্চলে বেশী অনুসারী রয়েছে। বিশ্বে ইসলাম ধর্মালম্বীর সংখ্যা (সুন্নি ইসলাম, শিয়া ইসলাম, সুফিবাদ ও অন্যান্য ইসলামি বিশ্বাস) ১৪০০ মিলিয়ন। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়।
(৩) হিন্দু ধর্ম - মূলত হিন্দুধর্ম ভারতীয় উপমহাদেশে সব চেয়ে প্রচলিত ধর্ম। হিন্দু ধর্মাবলম্বীগণ স্বীয় ধর্ম মতকে সনাতন ধর্ম বলে থাকে। হিন্দুধর্ম একাধিক ধর্মীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গঠিত। এই ধর্মের কোনো একক প্রতিষ্ঠাতা নেই। লৌহযুগীয় ভারতের ঐতিহাসিক বৈদিক ধর্মে এই ধর্মের শিকড় বলে মনে করা হয়। হিন্দুধর্মকে বিশ্বের "প্রাচীনতম জীবিত ধর্ম বিশ্বাস" বলা হয়। “বেদ” হিন্দু ধর্মের ধর্মগ্রন্থের নাম। “বেদ” হল প্রাচীন ভারতে রচিত একাধিক ধর্মগ্রন্থের একটি সমষ্টি । হিন্দুশাস্ত্র শ্রুতি ও স্মৃতি নামে দুই ভাগে বিভক্ত। বেদের অপর নাম শ্রুতি (যা শোনা হয়েছে)। অন্য ধর্ম গ্রন্থগুলিকে বলা হয় "স্মৃতি” (হিন্দুধর্ম)। “স্মৃতি" (যা মনে রাখা হয়েছে)। বেদকে "অপৌরুষেয়" (মানুষের দ্বারা রচিত নয়) মনে করা হয়। হিন্দুরা বিশ্বাস করে, বেদ প্রত্যক্ষভাবে ঈশ্বর কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও উপনিষদ্‌, পুরাণ, ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণ, মহাভারত, ভগবদ্গীতা নামে পরিচিত মহাভারতের কৃষ্ণ-কথিত একটি অংশ বিশেষ গুরুত্বসম্পন্ন ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা পেয়ে থাকে। হিন্দু ধর্মের উৎপত্তির সময়কাল - ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ, কিছু বিষয়ে ২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। সুপরচিত ধর্মসমূহের মধ্যে প্রাচীনতম। মূলত ভারত, নেপাল, শ্রীলংকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ, বাংলাদেশ এবং ইন্দোনেশিয়ার বালি উপ-প্রদেশে আধিক্য রয়েছে। সারা বিশ্বে হিন্দু ধর্মাবলম্বী (বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, স্মার্ত, আর্য সমাজ, অন্যান্য হিন্দু বিশ্বাস) আছে ৯০০ মিনিয়ন।
(৪) বৌদ্ধ ধর্ম - বৌদ্ধ ধর্ম বা ধর্ম (পালি ভাষায় ধম্ম) গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক প্রচারিত একটি ধর্ম বিশ্বাস এবং জীবন দর্শন। বর্তমানে বৌদ্ধ ধর্ম তিনটি প্রধান মতবাদে বিভক্ত। প্রধান অংশটি হচ্ছে হীনযান বা থেরবাদ (সংস্কৃত: স্থবিরবাদ)। দ্বিতীয়টি মহাযান নামে পরিচিত। তৃতীয়টি হচ্ছে বজ্রযান বা তান্ত্রিক মতবাদ। বাস্তবিক অর্থে "বুদ্ধ" বলতে একজন জ্ঞানপ্রাপ্ত, উদ্বোধিত, জ্ঞানী, জাগরিত মানুষকে বোঝায়। উপাসনা বা ধ্যনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং পরম জ্ঞানকে বোধি বলা হয়। সেই অর্থে যে কোনও মানুষই বোধপ্রাপ্ত, উদ্বোধিত এবং জাগরিত হতে পারে। আর যে ব্যক্তি এই বোধি জ্ঞান লাভ বা ধারন করেন তাকে বলা হয় বোধিসত্ত্ব। ত্রিপিটক বৌদ্ধ ধর্মীয় পালি গ্রন্থের নাম। বুদ্বের দর্শন এবং উপদেশের সংকলন। পালি তি-পিটক হতে বাংলায় ত্রিপিটক শব্দের প্রচলন। তিন পিটকের সমন্বিত সমাহারকে ত্রিপিটক বোঝানো হচ্ছে। এই তিনটি পিটক হলো বিনয় পিটক, সূত্র পিটক ও অভিধর্ম পিটক। বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তির সময়কাল - খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দী। উৎপত্তি ভারতে। পূর্ব এশিয়া ববং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে অনুসারী বেশী। সারা বিশ্বে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীর সংখ্যা (মহাযান, থেরবাদ, বজ্রযান) - ৩৭৬ মিনিয়ন।
(৫) কনফুসীয় ধর্ম - কনফুসীয় ধর্ম চীনের একটি নৈতিক ও দার্শনিক বিশ্বাস ও ব্যবস্থা যা বিখ্যাত চৈনিক সাধু কনফুসিয়াসের শিক্ষার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ কনফুসিয়াস হলেন কনফুসীয় ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। এটি মূলত নৈতিকতা, সমাজ, রাজনীতি, দর্শন এবং ধর্মীয় বিশ্বাস ও চিন্তা ধারাসমূহের সম্মিলনে সৃষ্ট একটি জটিল ব্যবস্থা যা একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত পূর্ব এশিয়ার সংস্কৃতি ও ইতিহাসে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। কনফুসিয় মতবাদ একটি নৈতিক বিশ্বাস এবং দর্শন। এটাকে ধর্ম বলা হবে কিনা এই নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মাঝে মতভেদ আছে। অনেক শিক্ষাবিদ কনফুসিয় মতবাদকে ধর্ম নয় বরং দর্শন হিসেবে মেনে নিয়েছেন। কনফুসিয় ধর্মের মূলকথা হচ্ছে মানবতাবাদ। কনফুসীয় ধর্মর উৎপত্তির সময়কাল - খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দী। উৎপত্তি ভারতে। চীনে বেশী। সারা বিশ্বে কনফুসীয় ধর্মালম্বীর সংখ্যা ১৫০ মিলিয়ন।
============
তথ্য সুত্রঃ
(১) C.J. Classification of religions: Geographical - Encyclopædia Britannica
(২) Philosophy of Religion - Encyclopædia Britannica
(৩) BANGLARKOTHA
(৪) Wikipedia

Comments

Popular posts from this blog

" আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি " -

ধর্মের নামে ভন্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে

রুদ্রাক্ষ - এক দুর্লভ বস্তু।