প্রকৌশলী ....... আত্মহননের চিন্তায় মগ্ন।।
পৃথিবীর শেষ প্রান্তে সুজলা সুফলা এক রাজ্যে ছিল। রাজ্যের প্রজারা ছিল খুব আবেগী সহজ সরল। অল্পতেই তারা খুশি থাকতো। সে রাজ্যে ১৮২৫ দিন পর পর রাজা পরিবর্তন হতো। এই পরিবর্তন হতো প্রজাদের দ্বারা। এই বোকা প্রজাদের কাজ ছিল শুধু রাজা পরিবর্তন করা। মাঝে মাঝে তাও লাগতো না একবারতো এক রাজা জোর করে ন বছর রাজ্য শাসন করেছে। আমাদের গল্প আসলে এইটা না –
সেই রাজ্যে এক আবেগী প্রকৌশলী ছিল বয়সে টগবগে তরুণ। ধরে নেই তার নাম অর্ণব। মূল গল্পে আসি - খুব অল্প সময়ে অর্ণব সব বিষয়ে দক্ষতা প্রমাণ করিল। সে টেন্ডারিং হোক বা ড্রইং ডিজাইন যাইহোক। সর্ব ক্ষেত্রেই অর্ণব চৌকস। কিন্তু সে খুব অল্প সময়ে হতাশ হইতে শুরু করিল। সে লক্ষ্য করিল রাজ্যর নির্মাণ প্রকল্পগুলোতে অনিয়মে ভরা। রাজা প্রজাদের কল্যাণে বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে - হাসপাতাল , সেতু্, সড়ক, দালান কোঠ আরো কতো কিছু। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাজ্যে বিভিন্ন দপ্তর ছিল। এই দপ্তরগুলো আবার টেন্ডার নামক এক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিত - এই সব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য। এই তরুণ অর্ণব দেখিল কাজ পেতে কোন প্রতিযোগিতার প্রয়োজন হয় না। সে "নেগোসিয়েশন বা নিগু" বলে একটা নতুন শব্দের সাথে পরিচিত হল। প্রজাদের দ্বারা নির্বাচিত কিছু প্রতিনিধি আছে তারা এই নিগুর ব্যবস্থা করে দিত ২% হতে ১০% পযন্ত্র অর্থের বিনিময়ে।মাঝে মাঝেতো এ নিয়েতো রক্তারক্তি কারবার। তার ভিতর হতাশা বাড়তে থাকলো। সে চিন্তিত হয়ে গেল এই অতিরিক্ত অর্থ ঠিকাদার উঠাবে কি ভাবে? ঠিকাদার কাজের আদেশ পাইয়া কাজ শুরু করিল।
অর্ণবের আর কিছুই ভালো লাগেনা। রড গুলো চার ইঞ্চির জায়গায় ছয় ইঞ্চি পর পর দেয়া হচ্ছে। ঢালাইগুলো ১ঃ২ঃ৪ অনুপাতের জায়গায় ১ঃ৩ঃ৬ করা হচ্ছে। এ গ্রেডের জায়গায় বি গ্রেড কখনো তার চেয়েও খারাপ পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। এক নাম্বার ইটের জায়গায় দুই নাম্বার ইট ব্যবহার হচ্ছে। মোটা বালুর জায়গার চিকন বালু। ভালো সিমেন্টের পরিবর্তে খারাপ সিমেন্ট। কখনো কখনো রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করা হচ্ছে। কোন কিছুই নিয়ম মোতাবেক হচ্ছে না। অবাক হয়ে দেখল এই সব নির্মাণ সামগ্রীর মান পরীক্ষার জন্য "রাজ্য প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যাল "-য়ে পাঠানো হচ্ছে। তবে যে নমুনা পরীক্ষার জন্য সীলগালা করে পাঠানো হয় তাহা আবার ঠিকই সঠিক মানের হয়ে থাকে। কি এক হাস্যকর অবস্থা। আর নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য সামান্য ব্যবস্থাও করে না নির্মাণ প্রতিষ্ঠান গুলো নেই হেলমেট, সেফটি সু ইত্যাদি। সে বুঝিতে পারে কেন সেতু দালান ভাঙ্গিয়া পড়ে। কেন সড়ক গুলো টেকসই হয় না। তার ভিতর হতাশা বাড়িতে থাকিল।
নির্মাণ কাজ চলিতে থাকে। এক বছরের প্রকল্প দুই তিন বছরেও শেষ হয় না। ঠিকাদারে অর্থের দরকার তৈরী হল ১ম ২য় ৩য় চলতি বিল। শুরু হল হিসাব নিকাষ ভাগবাটোয়ারা। মনে আছে রড গুলো চার ইঞ্চির জায়গায় ছয় ইঞ্চি পর পর দিয়েছিল। ভাগ হল নিখুত ঠিকাদারের ৬০% রাজার দপ্তরের প্রকৌশলীরা পেল ৪০%। কাজের মান খারাপ হল আবার রাজ্যের কোষাগার থেকে অর্থ খরচ হয়ে গেল। এবার ঠিকাদার চেক নিতে গেল - হায় হায় একি অবস্থা। বিভিন্ন টেবিলে টেবিলে চলে শতকরার হিসেবে। অবশেষে ঠিকাদার পেল চেক।
তরুণ অর্ণব ব্যাথিত মনে চিন্তা করিল কতো স্বপ্ন ছিল রাজ্যর ভালোর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করিবে সততার সাথে চলিবে। চুরি করিতে পারে না দেখে নিয়োগ কর্তার তিরস্কার। সে অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে।
চাকুরী হারিয়ে পথে পথে ঘুরতে থাকে। এ রাজ্যে যে প্রতিভা সততার মূল্যায়ন নেই। অর্ণব জীবন নিয়ে এক গভীর হতাশার ভিতর নিমজ্জিত হয়ে গেল। এক উদাসীন বিকেলে নিরিবিলি সাগর পাড়ে বসে আত্মহননের চিন্তায় মগ্ন। হঠাৎ হেল্প হেল্প চিৎকারে তাহার ধ্যান ভঙ্গ হইল। দেখল এক লোক পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। অর্ণব নিজের মৃত্যুর কথা ভুলিয়া নাকবোচা এক বেচারাকে উদ্ধার করিল। মিঃ লিও রবার্ট কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিয়া অর্ণবকে ঈশ্বর মানিয়া - তাহার রাজ্য ফিরিয়া গেলেন। সে যে ভিন রাজ্যর মানুষ।
বছর পার হল দেখতে দেখতে প্রায় দেড় যুগ পার হইতে চলিল। ভিন রাজ্যে বসে অর্ণব চিন্তা করে নিজ রাজ্যে প্রতিভা সততার মূল্য সে পায় নাই। আজ অন্য রাজ্যর উন্নয়নে নিজেকে উজার করে দিয়েছে। এরা যে তার প্রতিভা সততার মূল্যায়ন করে। প্রাপ্য সন্মান টুকু দিতে জানে।
আজ মাঝ বয়সে এসে প্রকৌশলী অর্ণব স্মৃতি কাতর হয়ে পরে - সন্ধ্যা হলে গ্রামের পাশ দিয়ে বহমান রেললাইনে বসে আড্ডা দিত। চাঁদা দেখা। করিমের বাঁশীর সুর। বাঁশঝাড়ের গাঁ ছমছমে ভৌতিক পরিবেশ। অহারে কি সুন্দর জীবন ছিল। আজ তার অর্থ সম্পদ সন্মান সব আছে তারপরও কি যেন নাই -জীবনটাকে মাঝে মাঝে বড় অভিশপ্ত লাগে। তার চোখজোড়া জলে ভরে উঠে নিজে মাতৃভূমি - নিজ রাজ্যের জন্য।
অর্ণব শুনতে পায় তার জন্মভুমি রাজ্যে নাকি এক মমতাময়ী রাজা এসেছেন। তিনি নাকি এইসব অনিয়মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। ভালো লাগে তার কিন্তু আবার ভয় লাগে একা কি করবেন এই মমতাময়ী। সে আশার আলো দেখতে পায়। এবার নিশ্চয়ই তরুণ প্রজন্ম প্রতিভা সততার মূল্য পাবে। আহাঃ আর কাউকে যেন তার মতো অন্য রাজ্যে চলে যেতে না হয়। প্রতিভাগুলো যেন রাজ্যর উন্নয়নে লাগে। এক অবাক করা ভালো লাগা পেয়ে বসল অর্ণবের। চোখে রাজ্যর স্বপ্ন নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
Comments
Post a Comment