খন্দকার মোশতাকের ৮৩ দিনের শাসনামলে মন্ত্রিসভার সদস্য ও অন্যান্যরা - (প্রথম পর্ব)

(১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বাঙালি জাতির ইতিহাসে জঘন্যতম এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে খন্দকার মোশতাক আহমেদ তার প্রথম বেতার ভাষণে এ বিষয়ে ‘টু’ শব্দটি করেননি। মনে হয়েছিল আসলে কিছুই ঘটেনি, সব স্বাভাবিক আছে।)

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে আমরা সবাই বলি লিখি জানি - "কয়েকজন বিপথগামী জুনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের কাজ"। এটা কোন ভাবেই সমর্থন যোগ্য না। এতো বড় ঘটনা কোন ভাবেই কয়েক জন জুনিয়র সাময়িক সদ্যসদের দ্বারা ঘটানো সম্ভব না। সে সময়ের খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রীসভায় যারা রাতারাতি যোগ দিয়েছিল তাদের কার কি অবস্থান ছিল? জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর লাশ সিঁড়িতে পড়ে রয়েছে। আর এরা বঙ্গবন্ধুর রক্ত পায়ে মাড়িয়ে মোশতাকের মন্ত্রীসভায় মন্ত্রীত্বগ্রহণ নিয়ে ব্যস্ত হয়েছিল। 
------------
মোশতাক মন্ত্রীসভা - 
রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক, উপরাষ্ট্রপতি মোহাম্মদউল্লাহ, স্পিকার আবদুল মালেক উকিল
----------
মন্ত্রী- 
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর, পরিকল্পনামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী, অর্থমন্ত্রী ড. আজিজুর রহমান মল্লিক, শিক্ষামন্ত্রী ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবদুল মান্নান, কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রী আবদুল মোমিন, এলজিআরডি মন্ত্রী ফণিভূষণ মজুমদার, নৌপরিবহনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, গণপূর্ত ও গৃহায়নমন্ত্রী সোহরাব হোসেন। 
-----------
প্রতিমন্ত্রী- 
ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী কে এম ওবায়দুর রহমান, ভূমি ও বিমান প্রতিমন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, রেল ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী নূরুল ইসলাম মঞ্জুর, তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, শিল্প প্রতিমন্ত্রী নূরুল ইসলাম চৌধুরী, ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রতিমন্ত্রী ডা. ক্ষিতিশ চন্দ্র মন্ডল, পশু ও মৎস্য প্রতিমন্ত্রী রিয়াজউদ্দিন আহমদ ভোলা মিয়া যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আলতাফ হোসেন ও মোমিনউদ্দিন আহমদ (বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় ছিলো না) এবং রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা  মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী (মন্ত্রীর সমমর্যাদায়)। 
এই সব কুলাঙ্গার বিশ্বাসঘাতকদের নিয়ে ধারাবাহিক পোস্ট। আজ থাকছে খন্দকার মোশতাকের উপরাষ্ট্রপতি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, পরিকল্পনামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীদের কথা। ( বিঃদ্রঃ তথ্যর ঘাটতি হলে বা কোন ব্যত্যয় হলে কমেন্টে সংশোধন করে দিবেন)
১) খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি। বঙ্গবন্ধুর সরকারের বাণিজ্য ও বহিঃ বাণিজ্য মন্ত্রী ছিল। বিশ্বাসঘাতক মোশতাক ১৫ আগষ্ট সকাল দশটায় রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথগ্রহণ করে। আগের দিন বিকালে ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে শেখ রাসেলকে নিজের মাথার টুপি পড়িয়েছিল এই বিশ্বাসঘাতক। কি নির্মম নিষ্ঠুর অমানবিক। এই জাতীয় বেঈমানের কথা অল্পতে শেষ করা যাবে না। এই পদে মোশতাক মাত্র ৮৩ দিন ছিল। রাষ্ট্রপতির দ্বায়িত্ব নেবার পর ইনডেমিনিটি বিল পাশ করে। "জয় বাংলা" স্লোগান পরিবর্তন করে "বাংলাদেশ জিন্দাবাদ" স্লোগান চালু করে। "বাংলাদেশ বেতার" নাম পরিবর্তন করে "রেডিও বাংলাদেশ" করে। তার শাসনামলে চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মোঃ মনসুর আলী ও এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে (৩ নভেম্বর) নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থান সংগঠিত হয় কিংবদন্তীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ - বীর উত্তম নেতৃত্বে  ক্ষমতা চ্যুত হয় খুনি খন্দকার মোশতাক আহমেদ চক্র। এবং ১৯৭৬ সালে সামরিক শাসককে অপসারণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে ২ টি দুর্নিতির অভিযোগ আনা হয় এবং আদালত তাকে ৫ বছরের শাস্তি প্রদান করে। জেল থেকে মুক্তিলাভের পর আবার সক্রিয় রাজনীতি শুরু করে। ৫ মার্চ ১৯৯৬ সালে এই কুলাঙ্গার বিশ্বাসঘাতক মৃত্যু বরণ করে।
২) মোশতাকের উপরাষ্ট্রপতি ছিল মোহাম্মদউল্লাহ। মোহাম্মদউল্লাহর স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রবর্তন হয়েছিল বাকশাল ব্যবস্থা। মোহাম্মদউল্লাহই প্রথম মন্ত্রীদের মধ্যে মোশতাকের ডাকে সাড়া দেয়। বঙ্গবন্ধু সরকারের ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কারক মন্ত্রী ছিল। মোহাম্মদউল্লাহ ১৯৯১ সালে বিএনপির মনোনয়নে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। ১৯৯৬ সালে বিএনপি ত্যাগ করে পুনরায় আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। ১৯৯৯ সালের ১১ নভেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করে।
৩) মোশতাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিল বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। মোশতাক সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের কাজ করে। বঙ্গবন্ধুর সময়ে ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ থেকে ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। এর পর জেনেভায় বাংলাদেশের পক্ষে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষ দূত হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। এবং দেশে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মাত্র আট দিন আগে ৮ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রী সভায় বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রী হিসেবে যোগদান করে। পরে জিয়া ও এরশাদের আমলে - ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যের অবসান এবং তাদের নিরাপত্তা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়। ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়। এই কুলাঙ্গার ১৯৮৭ সালে ২ আগস্ট হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে লন্ডনে মারা যায়।
৪) মোশতাকের আইনমন্ত্রী ছিল মনোরঞ্জন ধর। এই কুলাঙ্গার কুখ্যাত ইনডেমনিটি বিলটির রচয়িতা। ১৯৭২ সালের মনোরঞ্জন ধর জাপানে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত নির্বাচিত হয় এবং পরে বঙ্গবন্ধু সরকারের আইন, সংসদ ও বিচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিল। বঙ্গবন্ধু তাকে মন্ত্রী নিয়োগ দেবার আগে বলেছিলেন বলেছিলেন ‘"দাদা আপনার কথার উপরে জীবনে কোন কথা বলিনি, আপনি যা বলবেন, যা করবেন সেটাতেই আমি রাজি"। এই কুলাঙ্গারের মৃত্যু ১৯৮৬ সাল (এ তথ্য আমি নিশ্চিত না কারো সঠিক তথ্য জানা থাকলে জানাবেন) ।
৫) মোশতাকের পরিকল্পনামন্ত্রী ছিল অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। বঙ্গবন্ধুর সরকারে শ্রম, সমাজ কল্যাণ ও ক্রিয়া মন্ত্রী ছিল। ১৯৭৭ সালে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হলে মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হয়। পরে তিনি বিএনপি-তে যোগ দেয়। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় বস্ত্রমন্ত্রী এবং ১৯৮১ সালে বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন সরকারের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে। এরপর ১৯৮৫ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেয় এবং ১৯৮৬ সালে এরশাদের মন্ত্রিসভায় ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ কর। ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এই কুলাঙ্গারের মৃত্যু হয়। ( কারো তারিখটা জানা থাকলে জানাবেন)
৬) মোশতাকের অর্থমন্ত্রী ড. আজিজুর রহমান মল্লিক। ভারতের প্রথম হাই কমিশনার (একই সঙ্গে নেপাল ও ভুটান) এবং পরে বঙ্গবন্ধু সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিল। পরে ১৯৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়। ১৯৮৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে প্রফেসর এমিরিটাস হিসেবে নিয়োগ দান করে। সর্বশেষ 'ন্যাশনাল ব্যাংক'-এর অনারারি চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারিতে এই কুলাঙ্গার মারা যায়।
চলবে ..................

Comments

Popular posts from this blog

" আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি " -

ধর্মের নামে ভন্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে

রুদ্রাক্ষ - এক দুর্লভ বস্তু।